অন্যান্য

চট্টগ্রামের পটিয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্য!

জিনিয়াস টিভির প্রতিবেদন,

পটিয়া বাংলাদেশের চট্টগ্রাম
জেলার
একটি উপজেলা।
অবস্থান
চট্টগ্রাম জেলার অর্ন্তগত পটিয়া
উপজেলার আয়তন ৩১৬.৪৭ বর্গ কিমি।
উত্তরে চান্দঁগাও থানা ও
বোয়ালখালী
উপজেলা, দক্ষিণে চন্দনাইশ ও
আনোয়ারা উপজেলা , পূর্বে
রাঙ্গুনিয়া
ও চন্দনাইশ উপজেলা এবং পশ্চিমে
কোতোয়ালী, ডবলমুরিং ও বন্দর
(চট্টগ্রাম) থানা। প্রধান নদী
কর্ণফুলী । নবনির্মিত কর্নফুলী ৩য় ব্রিজ
চট্টগ্রাম নগর ও পটিয়া উপজেলার
সংযোগ সেতু। এই উপজেলার উপর দিয়ে
গেছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক।
ইতিহাস
ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৪৫ সালে
পটিয়ায় একটি থানা প্রতিষ্ঠা করা
হয়। ১৯৮৪ সালে এটিকে উপজেলায়
উন্নীত করা হয়। ১৯৩০ এর দশকে এখানে
ব্রিটিশ-বিরোধী বিপ্লবী,
বিশেষতঃ
যুগান্তর দল ও চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন
অভিযানের সাথে জড়িত বিপ্লবীরা
এখানে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৩০-এর দশকে
কালারপোল সংঘর্ষে বিপ্লবী স্বদেশ
রায় ইংরেজ সেনাদের গুলিতে নিহত
হন। ১৯৩৩ সালের ফেব্রুয়ারীতে
গৈড়লা গ্রামে বিপ্লবী দলের
অধিনায়ক সূর্যসেন ও ব্রজেন্দ্রসেন
ইংরেজ সেনাদের হাতে ধরা পড়েন।
১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর দুটি
বোমারু
বিমান পটিয়া সদরে কয়েকদফা বোমা
হামলা চালিয়ে অনেক বেসামরিক
লোককে হত্যা করে। ১৯৭১ সালের ৩মে
মুজাফফরাবাদ গ্রামে পাকবাহিনী ও
রাজাকার-আলবদর সদস্যরা অসংখ্য
ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দেয় এবং
নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। ১৯২৯
সালে পটিয়া উপজেলার রশিদাবাদে
জন্মগ্রহণ করেন চট্টগ্রামের বিশিষ্ট
গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী আবদুল গফুর
হালী । তাঁর লেখা অসংখ্য আঞ্চলিক ও
মাইজভান্ডারী গান সারা
বাংলাদেশে জনপ্রিয়। আবদুল গফুর
হালীকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে
প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ‘মেঠো পথের গান’।
[২] জনসংখ্যার উপাত্ত
জনসংখ্যা প্রায় ৫,০০০০০ জন।
নির্বাচনী এলাকা: ২৮৮ (চট্টগ্রাম-১২),
পটিয়া অংশ , পশ্চিম পটিয়ার ৫টি
ইউ,পি চট্টগ্রাম – ১৩ আসনের
অন্তর্ভূক্ত।
শিক্ষা
শিক্ষার হার ৬৩%।
প্রশাসনিক অঞ্চল
পটিয়া উপজেলায় রয়েছে একটি
পৌরসভা , ৯টি ওয়ার্ড, ২২টি ইউনিয়ন
পরিষদ , ১২০টি মৌজা, এবং ১২৪টি
গ্রাম । পটিয়া শহর এলাকার আয়তন ৯.৯৬
বর্গ কিলোমিটার। শহর এলাকাটি ৯টি
ওয়ার্ড এবং ৯টি মহল্লায় বিভক্ত।
ইউনিয়ন গুলো হচ্ছেঃ আশিয়া ,
বড়ালিয়া , ছনহরা , ধলঘাট , হাবিলাস
দ্বীপ , হাইদগাঁও, জঙ্গলখাইন, কচুয়াই,
কাশিয়াইশ , কেলিশহর , খরনা,
কুসুমপুরা , শোভনদন্ডী , জিরি
কোলাগাঁও ইউনিয়ন , বড় উঠান, চর
লক্ষ্যা, চর পাথরঘাটা , জুলধা ,
শিকলবাহা , দক্ষিণ ভূর্ষি ও ভাটিখাইন
অর্থনীতি
ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্প সংক্রান্ত
তথ্যাবলী
এস. আলম. ষ্টীল
এস. আলম ভেজিটেবল
চেমন ইস্পাত
ওয়েশটারন মেরিন শিপ ইয়ার্ড
ডায়মন্ড সিমেন্ট
হক্কানী পেপার মিল
আম্মবীয়া নিটিং
বনফুল বিস্কুট ফেক্টরী
শাহ আমানত নিটিং
বিসিক শিল্প নগরী
গাউছিয়া পোলট্টি ফার্ম
জম জম মৎস্য খামার
আল্লাই সল্ট ক্রসিং
এছাড়াও পটিয়া উপজেলার ইন্দ্রপুলে
লবণ শিল্প কারখানা, বি সি ক শিল্প
নগরীতে বিভিন্ন শিল্প কারখানা,
উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলে পোলট্টি

ডেইরী শিল্প, দুগ্ধ খামার গড়ে
উঠেছে। মৎস্য উৎপাদন, ডেইরী,
পোলট্টি ফার্ম, লবণ শিল্প এবং
জাহাজ শিল্প এ উপজেলার
সম্ভাবনাময় খাত। পটিয়া উপজেলার
কোলাগাঁও ইউনিয়নে কর্নফুলী নদীর
তীরে ওয়েস্টার্ন মেরিন শীপ ইয়ার্ড
জাহাজ শিল্প প্রতিষ্ঠান আছে।
এখানে মাঝারী ধরনের জাহাজ
তৈরী
করা হয়। বর্তমানে উক্ত শিল্পের
মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা
হচ্ছে। প্রধান প্রধান কৃষি ফসল: ধান,
আলু, পান, শাকসবজি।
দর্শনীয় স্থান
1. বৌদ্ধ তীর্থ চক্রশালা মন্দির –
পটিয়া সদর থেকে প্রায় দুই
কিলোমিটার পূর্বে এর অবস্থান। বৌদ্ধ
যুগে চট্টগ্রামের আদি নাম ছিল চট্টলা।
তবে এটি চক্রশালা নামেই পরিচিত ।
পূর্বে এই স্থানে শুধু একটি মন্দির
ছাড়া আর কিছুই ছিলনা। সেই মন্দির
এর গায়ে পাথরে খোদাই করে লিখা
আছে “ফরাতারা স্থুপ-নবতর সংস্কার –
১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দ । এই স্থানে তথাগত
বুদ্ধ রেঙ্গুন থেকে আসার পথে অবকাশ
যাপন করেন এবং তিনি চংক্রমণ
করেছিলেন বলেই এই স্থান টিকে
চক্রশালা নামে অভিহিত করা হয়। [৩] 2. ঠেগরপুনি বুড়াগোঁসাই মন্দির –
পটিয়া উপজেলা সদর থেকে ৪ কি.মি.
দক্ষিণে ঠেগরপুনি গ্রামে এর অবস্থান।
এই স্থানটি আরাকান রাজ্যের
আরাকান পর্বতমালা অংশ ছিল।
আনুমানিক ৩৫০-৪০০ বছর পূর্বে
ছান্দামা রাজার আমলে এই স্থানে
একটি দীঘি ছিল , এটি ছান্দামা
দীঘি নামে পরিচিত ছিল। কালক্রমে
উক্ত রাজবংশ বিলুপ্ত হয় এবং ধীরে
ধীরে তা পরিত্যক্ত বনে পরিণত হয়।
উক্ত বনের মাটির নীচে চাপা পড়ে
প্রাচীন বুদ্ধমুর্তিটি। পরে সেই
মুর্তিটি মাটির নীচ থেকে উধ্বার
করে
সেই জায়গাতেই মন্দির নির্মাণ করা
হয়। [৩] 3. মুসা খাঁ মসজিদ – ১৬৫৮ খ্রিঃ,
১০৬৬ হিজরী সনে শাবান মাসে
আজিজ খাঁ মাওলানা হুলাইন গ্রামে এ
মসজিদ নির্মাণ করেন। ইহা প্রাচীণ
ঐতিহ্যমন্ডিত একটি দর্শনীয় স্থান।

4. বুড়া কালী মন্দির – ধলঘাট গ্রামে
তৎকালীন জমিদার রাজা রাম দত্ত
এটি প্রতিষ্ঠা করেছেন।
5. মহিরা ক্ষেত্রপাল – চৈত্র
সংক্রান্তির সময় এখানে মেলা বসে।
দুই’শ বছর পূর্বে এটি প্রতিষ্ঠিত।
6. ধলঘাট প্রীতিলতা ওয়াদ্ধাদার
ট্রাস্ট – বীরকন্যা প্রীতিলতা
ওয়াদ্ধাদার পটিয়ার ধলঘাট ইউনিয়নে
জন্মগ্রহণ করেন এবং ব্রিটিশ বিরোধী
আন্দোলনে বীবত্বপূর্ণ অভিযানে অংশ
গ্রহণ করে আত্মউৎসর্গ করেন। ধলঘাটে
প্রীতিলতার স্মৃতি মন্ডিত বাসস্থান
ও তাঁর আবক্ষমুর্তি অন্যতম দর্শণীয়
স্থান ।
7. কে ই পি যেড দেয়াং পাহাড়ে
অবস্থিত।
কৃতী ব্যক্তিত্ব
আবদুর রহমান (১৯০২-১৯৭৭) – জন্ম.
পটিয়া গ্রাম, শিক্ষাবিদ ও লেখক।
[তথ্যসূত্র প্রয়োজন ] আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ
(১৮৭১-১৯৫৩) – জন্ম. সুচক্রদন্ডী গ্রাম,
সংগ্রাহক ও লেখক।
আহমদ শরীফ (১৯২১ – ১৯৯৯) – জন্ম.
সুচক্রদন্ডী গ্রাম, শিক্ষাবিদ, সাহিত্য
সমালোচক, লেখক ও গবেষণামূলক
প্রবন্ধকার।
কালীপদ ভট্টচার্য (?-১৯৭৮) – জন্ম.
ধলঘাট গ্রাম, সাহিত্যিক।
[তথ্যসূত্র প্রয়োজন ] জীবন আলী (জীবন পন্ডিত) – জন্ম.
খানমোহনা গ্রাম, সঙ্গীতজ্ঞ ও পুঁথি
লেখক। [তথ্যসূত্র প্রয়োজন ] নবীনচন্দ্র দাস (১৮৫৩-১৯১৪) – জন্ম.
আলমপুর গ্রাম, সাহিত্যিক।
[তথ্যসূত্র প্রয়োজন ] নির্মলকুমার সেন (১৮৯৮-১৯৩২) –
জন্ম. কোয়েপাড়া গ্রাম, সূর্য সেনের
বিপ্লবী দলের সদস্য।
পূর্ণেন্দু দস্তিদার (১৯০৯-১৯৭১) –
জন্ম. ধলঘাট গ্রাম, রাজনীতিবিদ ও
লেখক। [তথ্যসূত্র প্রয়োজন ] প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার (১৯১১-১৯৩২)
– জন্ম. ধলঘাট গ্রাম, সূর্য সেনের
বিপ্লবী দলের সদস্য।
বিপিনবিহারী নন্দী (১৮৭০-১৯৩৭) –
জন্ম. খাইন গ্রাম, কবি।
[তথ্যসূত্র প্রয়োজন ] শশাঙ্কমোহন সেন (১৮৭২-১৯২৮) –
জন্ম. ধলঘাট গ্রাম, শিক্ষাবিদ, কবি ও
সাহিত্য সমালোচক। [তথ্যসূত্র প্রয়োজন ] অন্নদাচরণ খাস্তগীর (১৮৩০ – ১৮৯০) –
জন্ম. সুচক্রদন্ডী গ্রাম, খ্যাতনামা
চিকিৎসক ও গবেষণামূলক প্রবন্ধকার।
অপূর্ব সেন ভোলা (১৯১৫ – ১৯৩২) –
জন্ম. ছাত্রডান্ডি গ্রাম, সূর্য সেনের
বিপ্লবী দলের সদস্য। ১৯৩২ সালের ১৩
জুন পটিয়ার ধলঘাটে ইংরেজ
সিপাহীদের গুলিতে শহীদ হন।
[তথ্যসূত্র প্রয়োজন ] অর্ধেন্দু দস্তিদার (? – ১৯৩০) – জন্ম.
ধলঘাট গ্রাম, সূর্য সেনের বিপ্লবী
দলের সদস্য। জালালাবাদ পাহাড়ে
বৃটিশ সৈন্যের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ
হন। [তথ্যসূত্র প্রয়োজন ] আলী রজা (কানু ফকীর) – জন্ম.
ওশখাইন গ্রাম, যোগ, সঙ্গীত ও
আধ্যাত্মিক বিষয়ে বহু গ্রন্থের
রচয়িতা।
কেদারনাথ দাশগুপ্ত (১৮৭৮ – ১৯৪২) –
জন্ম. ভাটিখাইন গ্রাম, ব্যারিস্টার,
লেখক ও স্বদেশী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ
বুদ্ধিজীবী।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন ] আবদুল গফুর হালী(১৯২৯…।)-জন্ম-
রসিদাবাদ,স্নজ্ঞীত বিষয়ক [৪] আসকর আলী পন্ডিত- জন্ম:১৮৪৬।
স্থায়ী বসতি:পটিয়ার শোভনদণ্ডি
গ্রামে।
বিবিধ
সরকারী হাসপাতাল ০১টি
স্বাস্থ্য কেন্দ্র/ক্লিনিক ২২টি
পোষ্ট অফিস ১৯টি
নদ-নদী কর্ণফুলী
হাট-বাজার ২৮টি
ব্যাংক ১১টি
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান
মসজিদ ৪৭৬টি
মন্দির ৩৭টি
প্যাগোডা ০১টি
গির্জা ০২টি
সন্ন্যাসীর আশ্রম ২১টি[
(পটিয়া-উপজেলা প্রশাসনের
ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত )।

পটিয়ার আরো অনন্য বিষয়:-

===========================

ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৪৫ সালে পটিয়ায় একটি থানা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৮৪ সালে এটিকে উপজেলায় উন্নীত করা হয়। ১৯৩০ এর দশকে এখানে ব্রিটিশ-বিরোধী বিপ্লবী, বিশেষতঃ যুগান্তর দল ও চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন অভিযানের সাথে জড়িত বিপ্লবীরা এখানে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৩০-এর দশকে কালারপোল সংঘর্ষে বিপ্লবী স্বদেশ রায় ইংরেজ সেনাদের গুলিতে নিহত হন। ১৯৩৩ সালের ফেব্রুয়ারীতে গৈড়লা গ্রামে বিপ্লবী দলের অধিনায়ক সূর্যসেন ও ব্রজেন্দ্রসেন ইংরেজ সেনাদের হাতে ধরা পড়েন। ১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর দুটি বোমারু বিমান পটিয়া সদরে কয়েকদফা বোমা হামলা চালিয়ে অনেক বেসামরিক লোককে হত্যা করে। ১৯৭১ সালের ৩মে মুজাফফরাবাদ গ্রামে পাকবাহিনী ও রাজাকার-আলবদর সদস্যরা অসংখ্য ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দেয় এবং নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। ১৯২৯ সালে পটিয়া উপজেলার রশিদাবাদে জন্মগ্রহণ করেন চট্টগ্রামের বিশিষ্ট গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী আবদুল গফুর হালী। তাঁর লেখা অসংখ্য আঞ্চলিক ও মাইজভান্ডারী গান সারা বাংলাদেশে জনপ্রিয়। আবদুল গফুর হালীকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ‘মেঠো পথের গান’।

পটিয়া উপজেলার পটভূমি

ষষ্ঠ শতকে পটিয়াসহ চট্টগ্রাম সমতট রাজ্যভুক্ত হয়। সপ্তম শতক অবধি সমতটের খড়ুগ রাজবংশের রাজাদের দ্বারা শাসিত হয়। অষ্টম শতকে ধর্মপালের রাজত্বকালে তা পাল সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। নবম শতকে পটিয়াসহ চট্টগ্রাম আবার হরিকেল রাজ্যভুক্ত হয়। দশম শতক থেকে সপ্তদশ শতকের মধ্যবর্তী সময় অর্থাৎ ১৬৬৬ সন পর্যন্ত সাময়িক বিরতি থাকলেও চট্টগ্রাম সমগ্র দক্ষিণাঞ্চল আরাকান রাজ্যভুক্ত ছিল। বৌদ্ধযুগে চট্টগ্রাম ‘চক্রশালা’ নামে বহির্বিশ্বে পরিচিত ছিল। এ চক্রশালা পটিয়া সদর থেকে দুই মাইল দক্ষিণে অবস্থিত। আরাকান শাসকরা চক্রশালায় তাদের রাজধানী স্থাপন করেন। রাজা মেং ফালোং (সেকান্দার শাহ) এর শাসনকালে (১৫৭১-৯৩ খ্রি.) ‘চক্রশালা’ রাজধানী ছিল যেখানে চট্টগ্রামের দক্ষিণাংশ ও কক্সবাজার তাঁর দখলে ছিল। পটিয়াসহ পুরো চট্টগ্রাম মোগল সাম্রাজ্যভুক্ত হয় সম্রাট আকবরের বাংলা বিজয়ের আরো ৯০ বছর ১৬৬৬ সনে তাঁর প্রপৌত্র সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে। ব্রিটিশ শাসনের আগে এতদঞ্চল আরাকান আমলে ‘চক্রশালা’, মোগল আমলে ‘চক্রশালা পরগণা’ এবং ব্রিটিশ শাসনের প্রথম দিকে ‘চাকলা’ নামেই পরিচিত ছিল। ব্রিটিশ সরকার দক্ষিণ চট্টগ্রামের কেন্দ্র পটিয়ায় ১৯১০ সালে ৫জন মুন্সেফ নিয়ে মহকুমা মুন্সেফ কোর্ট স্থাপন করেন এবং তদানিন্তন ৫ থানার প্রশাসনিক কার্য পরিচালনার জন্য একজন সার্কেল অফিসার (ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট) নিয়োগ করেন। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে পটিয়ার ও রাউজানের কিছু অংশ নিয়ে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা গঠিত হয়। পরবর্তীতে পটিয়াকে ভেঙে ১৮৯৮ সালে আনোয়ারা, ১৯৩০ সালে বোয়ালখালী, ১৯৭৬ সালে চন্দনাইশ ও সর্বশেষ ২০০০ সালে কর্ণফুলী থানা গঠিত হয়। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তান আমলে পটিয়া মহকুমা(জেলা) হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৮৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পটিয়া উপজেলা হিসাবে স্বীকৃতি পায়।

বাঙালি জাতির ইতিহাসে যে ক’টি বীরত্ব গাঁথা রয়েছে সে সবের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বীরত্বগাঁথা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। পৃথিবীর খুব কম জাতি রয়েছে, যারা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে, স্বাধীনতার জন্য প্রাণদিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে যারা অকাতরে প্রাণ দিয়েছিলেন, তাঁদের সুবাদেই বাঙালি জাতি শত শত বছর পরাধীনতার শৃঙ্খলে থাকার পরও বীরের জাতিতে পরিণত হয়েছিল। এই মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে বীর প্রসবিনী পটিয়া। বৃটিশ শাসনামল হতে শিক্ষা দীক্ষায় অগ্রসর পটিয়া মুক্তিযুদ্ধের সময়ও ছিল অগ্রভাগে। বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, বাংলাদেশের স্থপতি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অন্যতম তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী বিভূষি ভূষণ চৌধুরী প্রকাশ মানিক চৌধুরী ছিলেন পটিয়ার হাবিলাসদ্বীপ গ্রামের সূর্যসন্তান (এই সূর্য সন্তানের জন্য আমরাও গর্বিত)। ১৯৭০ সালের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী অধ্যাপক নুরুল ইসলাম চৌধুরী ও সুলতান কুসুমপুরী বিজয়ী হওয়ার পর হতেই মূলত ঐতিহাসিক পটিয়া আন্দোলন সংগ্রামে মুখরিত হয়ে উঠে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের সেই কালো রাতে যখন বর্বর পাকিস্তানী সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের নামে ঢাকায় নিরস্ত্র প্রতিরোধের পরিকল্পনাপ্রণয়ন করা।
২৬ মার্চ চট্টগ্রাম (আগ্রাবাদ) বেতার কেন্দ্র হতে প্রথমে এম এ হান্নান ও পরে ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করলে পটিয়াবাসী তথা সারা দেশের মানুষ উজ্জীবিত হয়। সেদিন ঝাউতলা রেলস্টেশনসহ চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে বিহারী কর্তৃক বাঙালি নিধনের সংবাদেও পটিয়াবাসী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করে। পটিয়ার জাতীয় পরিষদ সদস্য অধ্যাপক নুরুল ইলাম চৌধুরী, পূর্ণেন্দু দস্তিদার, চৌধুরী হারুনুর রশিদ,আবুল মাসুদ চৌধুরী, নুরুন্নবী, অধ্যক্ষ নুর মোহাম্মদ, শামসুদ্দিন আহমদ, নুরুল ইসলাম চৌধুরী,অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন দাশ, অধ্যাপক শামসুল ইসলামসহ আরও অনেকের নেতৃত্বে পটিয়াবাসী মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। পটিয়ার সর্বস্তরের জনতা সেদিন পূর্ববাংলার স্বাধীনতার নেশায় উম্মাদ হয়ে উঠে। হাজার হাজার ছাত্র-জনতা ভারতে গিয়ে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়।অনেকে দেশের অভ্যন্তর থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করে। মুষ্ঠিমেয় কিছু স্বাধীনতা বিরোধী থাকলেও মূলত: পটিয়া ছিল স্বাধীনতাকামী মুক্তি পাগল জনতার দুর্ভেদ্য দূর্গ। সম্ভবত একমাত্র পটিয়া’ই ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত হানাদার মুক্ত তথা স্বাধীন ছিল।

পটিয়াবাসীর রাজনৈতিক সচেতনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেয়ার কথাটি বুঝতে পেরে যুদ্ধের প্রথমদিকেই পাকিস্তানী বিমানবাহিনী ১৪ এপ্রিল শুক্রবারে পটিয়া সদরে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে। সেদিন প্রায় অর্ধশতাধিক লোক শহীদ হন। যুদ্ধের শুরুতে পাকিস্তানী বাহিনীর এই বর্বরতা পটিয়াবাসীকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রেরণা জোগায়। মুক্তিযুদ্ধে শুরুতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠকারী মেজর জিয়াউর রহমান ও তৎকালীন পটিয়ার সন্তান ক্যাপ্টেন অলি আহমদ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র পতনের পর পটিয়ার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের হুলাইন গ্রামের আমিন শরীফ চৌধুরী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিশ্রাম নিয়েছিলেন বলে জানা যায়। স্বাধীনতা যুদ্ধের বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ক্যাপ্টেন অলি আহমদ ‘বীর বিক্রম’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন।

পটিয়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের মধ্যে অনেকের নাম আজ মনে না থাকলেও কিছু মুক্তিযোদ্ধার ও সংগঠকেরনাম আজও স্মৃতিতে জ্বল জ্বল করছে। তাদের মধ্যে এডভোকেট জালালউদ্দিন আহমদ চৌধুরী, এস এম ইউসুপ, আহমদ শরীফ মনির, ধীরেন দাশ, মোহাম্মদ মহসিন, আহমদ নবী, মাহফুজুর রহমান খান,আবদুস ছালাম, শামসুদ্দিন আহমেদ, আবদুল বারিক, প্রফেসর শামসুল ইসলাম, নুরুল ইসলাম চৌধুরী, নাসিরুদ্দিন চৌধুরী, ফজল আহমদ চৌধুরী, দীলিপ কান্তি দাশ, শাহ আলম, অনিল নালা, আবুল কাশেম, ফজলুল হক, আবদুস শুক্কুর, আবু তাহের বাঙালি, মুক্তিমান বড়ুয়া, মাওলানা এমদাদ, ফজলআহমদ, নূর মোহাম্মদ, শহীদ সুবেদার আবদুস ছালাম, মরহুম মোজাহেরুল হক, আ.জ.ম. সাদেক,কাজী আবু তৈয়ব, মহিউদ্দিন, একেএম আবদুল মতিন, প্রদ্যুৎ পাল, চৌধুরী মাহবুব, ইউসুপ খান, শিরু বাঙালি, আবদুস ছবুর, মোহাম্মদ আসলাম, মো: রফিক খান, রফিক আহমদ, ফেরদৌস চৌধুরী, আবু তাহের, সোলেমান কমান্ডার, সোলায়মান খান, আবদুল হক, স্বপন চৌধুরী, আবুল হাশেম মাস্টার প্রমুখের নাম উল্লেখ্যযোগ্য। চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ক্যাপ্টেন করিমের নাম অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। তিনি পটিয়ার অধিবাসী না হলেও মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধার নাম ছিলেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তিনি বিজয়ের পূর্ব মুহূর্তে শহীদ হয়েছিলেন। বিনিনেহারার ডা. শামসুল আলম ও গৈড়লার আহমদ হোসেন মাস্টার মুক্তিযোদ্ধাদের যাবতীয় সহায়তা করতেন বলে জানা যায়। এ দু’জনের বাড়ি মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি হিসেবে সুপরিচিত ছিল।

পটিয়ার মুক্তিযুদ্ধে মিলিটারী পুলের পাক বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ যুদ্ধের কথা মনে হলে আজও গা শিউরে উঠে। সেপ্টেম্বর সংঘটিত এই যুদ্ধে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছিলেন। পাকিসত্মানীদের অত্যাধুনিক অস্ত্রের আক্রমনের মুখে পেরে না উঠে মুক্তিযোদ্ধাদের শেষ পর্যমত্ম পিছু হটেছিলেন, সে যুদ্ধে হুলাইনের সোলেমান কমান্ডার, সোলায়মান খানসহ ১৫ জন মুক্তিযোদ্ধা অংশ নিয়েছিলেন। যুদ্ধের পর পাকিস্তানী বাহিনী ক্রোধান্বিত হয়ে পুরো সেনেরহাট জ্বালিয়ে দেয় এবং হাবিলাসদ্বীপ গ্রামের শত শত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঘর বাড়ি জ্বালিয়েদেয়। সেদিন হানাদার বাহিনীর সাথে দেশীয় অনেক রাজাকারও অংশ নিয়েছিল বলে জানা যায়। সেদিন চরকানাই ফুলতলে হুলাইনের শামসুল আলম পাকিস্তান বাহিনীর হাতে শহীদ হন। পটিয়ার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মোজাফফরাবাদ হত্যাকান্ড বেদনার স্মৃতি হিসেবে আজীবন সকলের মনে থাকবে। পাকিস্তানী আর্মি মোজাফফরাবাদে সেদিন শতাধিক বাড়ি জ্বালিয়ে দেয় এবং অর্ধশতাধিক লোককে হত্যা করেছিল।

পটিয়ার মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় স্মৃতি হয়ে আছে ধলঘাট,গৈড়লার টেক ও জিরি মাদ্রাসার যুদ্ধ। যে যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের পাক হানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের সন্ত্রস্ত্র করতে পেরেছিলেন। পটিয়ার মুক্তিযোদ্ধারা খাসমহল আক্রমন করে জ্বালিয়ে দিয়েছিল। আক্রমন করেছিলেন লাখেরার ওয়্যারলেস সেন্টার। মনসার টেকে রাজাকার কর্তৃক স্বাধীনতাকামী নিরীহ মানুষকে হত্যার ঘটনা যুদ্ধের বেদনাবহ স্মৃতির অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ের একদিন সকালে হুলাইন গ্রামের মানুষ হতচকিয়ে গিয়েছিল। কেননা এর আগের দিন রাত্রে গ্রামের প্রায় কয়েক’শ কিশোর-তরুণ একযোগে যুদ্ধে অংশ নেয়ার উদ্দেশ্যে প্রশিক্ষণের জন্য ভারতের উদ্দেশ্যে গ্রাম ছেড়েছিল। এতগুলো ছেলের একযোগে গ্রাম ত্যাগে পুরো গ্রাম জুড়ে কান্নার রোল উঠেছিল।যাকে ঐতিহাসিক ঘটনা বলে চিহ্নিত করা যায়। সেদিন যারা যুদ্ধে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে ছিল তাদের মধ্যে নুরুল হাকিম, মরহুম কিবরিয়া, ইউসুপ খান, মরহুম হারুনুর রশিদ, সাইফুল্লাহ রফিক,আনোয়ারুল ইসলাম, হারুন খান, নুরু, সোলায়মান খান প্রমুখের নাম এখনও মনে আছে। সেদিন তাদের সাথে অগ্রজ মরহুম শফি খানও চলে গিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো তাদের অনেকেই মুক্তিযোদ্ধার সনদপত্র যোগাড় করতে পারেনি। হুলাইন গ্রামের তৎকালীন ছাত্রলীগের সদস্য মুজিবুর রহমান খান (বর্তমানে এডভোকেট) সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের ইনফরমার তথা সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বতোভাবে সহায়তা করতেন মরহুম আ.জ.ম. নুরুল আলম মাস্টার, মোজাফফর আহমদ, নেছার আহমদ চৌধুরী, জাফর আহমদ চৌধুরী ও মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী প্রমুখ। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার সেবাশুশ্রুষাঃ- পার্শ্ববর্তী বোয়ালখালী থানার খিতাপচর গ্রামের আলতাফ নামের একজন ইপিআর সদস্য মুক্তিযোদ্ধা পার্বত্য অঞ্চলে সম্মুখ যুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। পরবর্তীতে তাঁকে গোপনে চিকিৎসা দিয়ে কিছুটা সুস্থ হলে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তিনি প্রায় ২০ দিন থাকার পর সুস্থ হয়ে চলে গিয়েছিলেন।

১৬ ডিসেম্বর যখন পাকিস্থানী বাহিনী রেসকোর্স ময়দানে মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর প্রধান জগজিৎ সিং অরোরার নিকট আত্মসমর্পণ করে, তখন সারাদেশের মতো পটিয়াতেও আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। পটিয়ার সর্বত্র বিজয় দিবস উদযাপিত হয়। বিজয় দিবস উদযাপনের অংশ হিসেবে ১৭ ডিসেম্বর হাবিলাসদ্বীপ হাই স্কুলের মাঠে মুক্তিযোদ্ধারা বিজয় দিবস উদযাপন করেন। তিনটি এলএমজির সাহায্যে ফাঁকা গুলি ছুড়ে সেদিন উৎসবের সূচনা করা হয়েছিল।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Close
Close